উত্তরদাতা: শায়খ ফারাজ রব্বানী
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬
মূল লেখা (ইংরেজি): https://seekersguidance.org/answers/hanafi-fiqh/is-it-permissible-to-remove-hijab-to-find-employment/
বাংলা অনুবাদ: আল-কুরআন একাডেমি
প্রশ্ন
আমি হিজাব পরি। হাঙ্গেরিতে বাবা-মা আর মেয়েকে নিয়ে থাকি। একশোরও বেশি চাকরিতে আবেদন করেছি, কোথাও নেয়নি। আমার ধারণা, এর কারণ হয়তো হিজাব।
আমার স্বামী রোমানিয়ায় থাকেন। তার ব্যবসা ডুবতে বসেছে, আমাদের থাকার ব্যবস্থা করতে পারছেন না। আবার তিনি বলেন, আমি হিজাব খুললে তালাক দেবেন।
আর্থিক প্রয়োজনে সাময়িকভাবে হিজাব খোলা কি আমার জন্য জায়েয? আমি কি গুনাহগার হব? আর আমার ও আমাদের সন্তানের প্রতি স্বামীর দায়িত্ব কী?
উত্তর
পরম করুণাময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে।
একজন মানুষের যতটা বোঝা বহন করা উচিত, আপনি তার চেয়ে বেশি বহন করছেন। আপনার প্রশ্নে যে ভয় ফুটে উঠেছে, তা আপনার দুর্বলতা নয়।
চাকরি পাওয়ার জন্য হিজাব খোলা জায়েয নয়। আপনি যে আর্থিক কষ্টের কথা বলেছেন, তা বাস্তব ও ভারী হলেও শরিয়তের সেই “ইকরাহ” বা বাধ্যতার পর্যায়ে পৌঁছায় না, যেখানে পর্দা খোলা বৈধ হয়ে যায়।
সেই সীমা খুব সংকীর্ণ। তা এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যার জীবন বা অঙ্গহানির সত্যিকার আশঙ্কা আছে। আপনি কষ্টে আছেন, তবে আল্লাহর দয়ায় আজ রাতে আপনার ও আপনার মেয়ের মাথার উপর বাবা-মায়ের মাধ্যমে ছাদ আছে।
আপনি জিজ্ঞেস করেছেন, গুনাহ হবে কি না। জেনে-বুঝে পর্দা খোলা গুনাহ হবে। আপনি সরাসরি প্রশ্ন করেছেন, তাই আমিও সরাসরি উত্তর দিচ্ছি।
তবে একজন ভীত নারী, যে গুনাহটি করতে চায় না, তার গুনাহ আর স্বাচ্ছন্দ্যে থাকা কারো গুনাহ একই পাল্লায় মাপা হয় না। আর তওবার দরজা আপনার জন্য কখনো বন্ধ নয়। কোনো পরিস্থিতিই আপনাকে আল্লাহর রহমতের বাইরে নিয়ে যায় না।
আপনার মতো নারীদের প্রশ্নের উত্তর হাবিব উমর আগেই দিয়েছেন
হাবিব উমর বিন হাফিজকে (আল্লাহ তাঁকে হেফাজত করুন) ফ্রান্সের মুসলিম নারীদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, যেখানে স্কুল ও কর্মস্থলে হিজাব নিষিদ্ধ।
মুওয়াসালায় প্রকাশিত এক উত্তরে তিনি বলেন: “কষ্টের সময়েই মুমিনদের আসল পরিচয় প্রকাশ পায়। নারীরা যতদূর সম্ভব তাদের লজ্জাশীলতা রক্ষা করবে, অবিচল থাকবে, সুন্দর আখলাক দেখাবে এবং যে কষ্টের মুখোমুখি হচ্ছে তা ধৈর্যের সাথে সহ্য করবে। শেষ পরিণাম মুত্তাকিদের জন্যই।”
আরেকবার, প্রকাশ্যে হিজাব পরতে ভয় পাওয়া বোনদের ব্যাপারে প্রকাশিত আরেক উত্তরে তিনি বলেন, “তাদের উচিত সুন্দর আখলাক দেখানোর চেষ্টা করা, মর্যাদাপূর্ণ থাকা এবং চারপাশের মানুষের সামনে সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।”
লক্ষ্য করুন, তিনি হিজাব খোলার অনুমতিও দেননি, আবার প্রশ্নকারী নারীদের তিরস্কারও করেননি। তিনি বলেছেন, এই চাপটাই পরীক্ষা, আর তার মোকাবেলা হবে মর্যাদা ও সুন্দর চরিত্র দিয়ে।
ঠিক এই অবস্থার জন্যই আল্লাহ একটি ওয়াদা দিয়েছেন
“যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন, এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দেন যা সে কল্পনাও করে না। আর যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।” [সূরা তালাক, ৬৫:২ থেকে ৩]
এই আয়াত আরামে থাকা মানুষের জন্য নাজিল হয়নি। এটা এমন এক অংশের শেষে এসেছে, যেখানে ভাঙা সংসার আর অনিশ্চিত রিযিকের কথা বলা হয়েছে। আপনি ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে আছেন।
আল্লাহর উপর ভরসা মানে কড়া নাড়া থামিয়ে দেওয়া নয়
ইমাম কুশাইরি (রহ.) লিখেছেন, তাওয়াক্কুলের স্থান হলো অন্তর। বান্দা যখন বুঝে নেয় যে তাকদির আল্লাহর পক্ষ থেকে, তখন বাহ্যিক চেষ্টা অন্তরের তাওয়াক্কুলের বিরোধী হয় না। [কুশাইরি, আর-রিসালা আল-কুশাইরিয়্যা]
ইমাম গাজালি (রহ.) আরও স্পষ্ট করে বলেছেন। কেউ কেউ মনে করে, তাওয়াক্কুল মানে শরীর দিয়ে উপার্জন আর অন্তর দিয়ে পরিকল্পনা ছেড়ে ফেলে রাখা ন্যাকড়ার মতো পড়ে থাকা। তিনি একে অজ্ঞদের ধারণা বলেছেন, কারণ তাওয়াক্কুলের প্রভাব প্রকাশ পায় বান্দার নিজের লক্ষ্যের দিকে চলা ও চেষ্টার মধ্যেই। [গাজালি, ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন]
তাই পর্দা রক্ষা করেই খুঁজতে থাকুন, আর অন্তরকে ফলাফলের উপর নির্ভর না করে আল্লাহর উপর রাখুন।
একশো আবেদন মানে অনেক চেষ্টা আর অনেক হতাশা। তবু হয়তো এমন অনেক দরজা আছে যেখানে এখনো পৌঁছাতে পারেননি: রিমোট ও অনলাইন কাজ, অনুবাদ ও শিক্ষকতা, নিজের ব্যবসা, হাঙ্গেরির মুসলিম ও অভিবাসী সমাজের নিয়োগকর্তা, আর স্বামীর ব্যবসার পাশাপাশি যা গড়ে তোলা যায়।
হাঙ্গেরিতে আপনার আইনি সুরক্ষার বিষয়েও খোঁজ নিন।
আপনার থাকা, খাওয়া ও পোশাকের দায়িত্ব স্বামীর
হানাফি মাযহাবে ভরণপোষণ (নাফাকা) হলো পাওনা দায়, কোনো দয়া নয়। ইমাম মাওসিলি (রহ.) বলেন, স্ত্রী যখন স্বামীর ঘরে নিজেকে তার কাছে সোপর্দ করে, তখন স্ত্রীর খাবার, পোশাক ও বাসস্থান স্বামীর উপর ওয়াজিব হয়ে যায়। [মাওসিলি, আল-ইখতিয়ার লি-তা’লিলিল মুখতার]
তিনি আলাদাভাবে বলেন, ছোট সন্তানদের নিজস্ব সম্পদ না থাকলে তাদের ভরণপোষণ বাবার উপর। [মাওসিলি, আল-ইখতিয়ার]
ব্যবসা ব্যর্থ হলে এই দায় মাফ হয় না। এর অর্থ হলো, তাকে কাজ করতে হবে, ধার করতে হবে বা সাহায্য নিতে হবে, আর আপনারা দুজন মিলে পরিকল্পনা করবেন, আপনার পর্দাকে সমাধানের পথ না ভেবে।
আর আপনি যদি কাজ পান, তাহলে আপনার উপার্জন আপনারই। তা আপনাআপনি সংসারের হয়ে যায় না, আর স্বামীর দায়ও কমায় না।
আপনার স্বামী যেমন বলছেন, হিজাব এমন কিছু নয় যা আপনি বিনিময়ে দিয়ে দেবেন।
শান্ত কোনো মুহূর্তে তাকে কোমলভাবে বলুন, যে স্ত্রী এমনিতেই ভয়ে আছে, তালাকের হুমকি তার ভয় আরও বাড়ায়। আর তিনি কখনো এ কথা না বললেও হুকুম একই থাকত, কারণ আপনার পর্দা আল্লাহর হক, তার নয়।
এখানে তার হুমকি সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে না। আপনি কারো চরমপত্রে নয়, আল্লাহর হুকুমে বাঁধা।
আপনার শুধু একটি উত্তর নয়, পাশে থাকার মতো একজন মানুষ দরকার
সামনের মাসগুলো শুধু একটি লিখিত উত্তর হাতে নিয়ে একা পার করবেন না। হাঙ্গেরিতে বা আমাদের মাধ্যমে একজন নির্ভরযোগ্য স্থানীয় আলেম বা বিশ্বস্ত শিক্ষক খুঁজে নিন, এবং একবারের আলাপ নয়, নিয়মিত পরামর্শের মধ্যে থাকুন।
তাকে টাকাপয়সা আর সংসার, পুরো চিত্রটাই বলুন, আর কয়েক সপ্তাহ পরপর আবার যান। তাদের কাছে এবং আপনার আশেপাশের নির্ভরযোগ্য মুসলিম নারীদের কাছে শুধু মাসআলা নয়, কাজ ও থাকার ব্যাপারে বাস্তব সাহায্যও চান।
এত কঠিন পরিস্থিতিতে এমন কাউকে দরকার, যে আপনার নাম জানে এবং খোঁজখবর রাখে।
কষ্টের সাথেই আসে স্বস্তি
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে আব্বাস (রা.)-কে বলেছিলেন: “জেনে রাখো, যা তোমার কাছে আসেনি তা কখনো তোমার কাছে আসার ছিল না, আর যা তোমার কাছে এসেছে তা কখনো তোমাকে এড়িয়ে যাওয়ার ছিল না। আর জেনে রাখো, সাহায্য আসে ধৈর্যের সাথে, স্বস্তি আসে কষ্টের সাথে, আর কঠিনের সাথেই আছে সহজ।” [রিয়াদুস সালিহীন]
এই দোয়াটি আঁকড়ে ধরুন। ইমাম নববি (রহ.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্দর দোয়াগুলোর মধ্যে এটি এমন ব্যক্তির জন্য উল্লেখ করেছেন, যে ঋণের বোঝায় চাপা:
اللهُم اكْفِني بحلالِكَ عنْ حَرَامِكَ، وأغْنِني بِفضلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
“হে আল্লাহ, তোমার হালাল দিয়ে আমাকে তোমার হারাম থেকে যথেষ্ট করে দাও, আর তোমার অনুগ্রহ দিয়ে তুমি ছাড়া অন্য সবার থেকে আমাকে অমুখাপেক্ষী করে দাও।” [নববি, আল-আযকার]
ইবনে আল্লান আল-বাকরি (রহ.) আল-আযকারের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, এখানে “যথেষ্ট করে দাও” কথাটিতে বিরত রাখার অর্থও আছে, অর্থাৎ তোমার হালাল দিয়ে আমাকে আটকে রাখো ও হেফাজত করো। [ইবনে আল্লান, আল-ফুতুহাতুর রাব্বানিয়্যা]
এটাই ঠিক আপনার দোয়া। আপনি আল্লাহর কাছে শুধু খাবার চাইছেন না। আপনি চাইছেন, তিনি যেন আপনাকে তাঁর হারামের দিকে ঠেলে দেওয়া থেকে রক্ষা করেন, আর হালালকেই যথেষ্ট করে দেন।
প্রতিদিন নামাজের পর এই দোয়া পড়ুন, চাইলে নিজের ভাষাতেও। আল্লাহ আপনাকে ভুলে যাননি।
আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
শায়খ ফারাজ রব্বানী
