Free Trial

ঢাকার ফ্ল্যাট হোক বা টরন্টো, সিডনি কিংবা লন্ডনের কোনো বাসা, প্রায় সব মা-বাবার মনে একটা প্রশ্ন ঘোরে: সন্তানকে কীভাবে মানুষ করব, যাতে সে দুনিয়াতেও ভালো থাকে, আখিরাতেও সফল হয়? প্যারেন্টিংয়ের বই আর ভিডিওর অভাব নেই। তবে মুমিন হিসেবে আমাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আদর্শ রাসূলুল্লাহ ﷺ। শিশুদের সাথে তাঁর আচরণ নিয়ে সহিহ হাদিসে অনেক ঘটনা এসেছে। সেগুলো পড়লে বোঝা যায়, তাঁর কাছে শিশুরা ছিল ভালোবাসা, দায়িত্ব আর রহমতের জায়গা। চলুন, নির্ভরযোগ্য হাদিসের আলোকে সেই আদর্শের কয়েকটি দিক ধীরে ধীরে দেখি, আর ভাবি আমাদের ঘরে আজ থেকেই কী বদলানো যায়।

সন্তানকে আদর করা ও মায়া প্রকাশ করাও সুন্নাহ

একদিন নবীজী ﷺ তাঁর নাতি হাসান ইবনে আলী (রা.)-কে চুমু খেলেন। পাশে বসা ছিলেন আকরা ইবনে হাবিস (রা.)। তিনি অবাক হয়ে বললেন, তাঁর দশটি সন্তান আছে, কিন্তু তিনি কখনো কাউকে চুমু খাননি। নবীজী ﷺ তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন:

«مَنْ لاَ يَرْحَمُ لاَ يُرْحَمُ»

“যে দয়া করে না, তাকে দয়া করা হয় না।”
(সহিহ বুখারি ৫৯৯৭; সহিহ মুসলিম ২৩১৮)

আরেকবার এক বেদুইন এসে বলল, আপনারা শিশুদের চুমু খান? আমরা তো খাই না। নবীজী ﷺ উত্তরে বললেন:

«أَوَ أَمْلِكُ لَكَ أَنْ نَزَعَ اللَّهُ مِنْ قَلْبِكَ الرَّحْمَةَ»

“আল্লাহ যদি তোমার অন্তর থেকে দয়া তুলে নেন, তাহলে আমি কী করতে পারি?”
(সহিহ বুখারি ৫৯৯৮; সহিহ মুসলিম ২৩১৭)

আমাদের সমাজে অনেক বাবা মনে করেন, সন্তানের সাথে দূরত্ব রাখলেই সম্মান বাড়ে। হাদিস কিন্তু উল্টো কথা বলে। কোলে নেওয়া, মাথায় হাত বুলানো, চুমু খাওয়া রহমতের প্রকাশ, আর নবীজী ﷺ এগুলোকে লজ্জার কিছু মনে করেননি। তাই ঘুমানোর আগে বা স্কুলে যাওয়ার সময় সন্তানকে একবার জড়িয়ে ধরুন, কপালে একটা চুমু দিন। কাজের চাপে বা প্রবাসে দূরে থাকলে ভিডিও কলে অন্তত একবার বলুন, “আমি তোমাকে ভালোবাসি, আল্লাহও তোমাকে ভালোবাসুন।” এই ছোট মায়াটুকুই শিশুর মনে নিরাপত্তার ভিত গড়ে দেয়।

সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ: সমতাই ভালোবাসা টিকিয়ে রাখে

মায়ার সাথে সাথে নবীজী ﷺ যে বিষয়ে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন, তা হলো সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ। সাহাবি নু‘মান ইবনে বাশির (রা.)-এর বাবা তাঁকে একটি উপহার দিয়ে নবীজী ﷺ-কে সাক্ষী রাখতে এলেন। নবীজী ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, অন্য সন্তানদেরও কি একই রকম দিয়েছ? উত্তর এল, না। তখন তিনি বললেন:

«فَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْدِلُوا بَيْنَ أَوْلاَدِكُمْ»

“আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করো।”
(সহিহ বুখারি ২৫৮৭; সহিহ মুসলিম ১৬২৩)

এরপর সেই সাহাবি উপহারটি ফিরিয়ে নেন। আলেমগণ বলেন, এই নির্দেশ মা-বাবা দুজনের জন্যই। দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়াতেও জীবদ্দশায় সন্তানদের কিছু দিলে ছেলে-মেয়ে সবাইকে সমানভাবে দেওয়ার কথা এসেছে। একজনকে বারবার প্রাধান্য দিলে ভাইবোনের মধ্যে হিংসা জন্মায়, যা অনেক সময় সারা জীবন থেকে যায়। কন্যাসন্তানকে বোঝা নয়, আল্লাহর রহমত হিসেবে দেখার বিষয়ে মাসিক আলকাউসারে মাওলানা আব্দুর রউফ সাখখারভীর একটি সুন্দর লেখা আছে, যা নিচের সূত্রে দেওয়া হলো। নিজেকে একবার প্রশ্ন করুন, প্রশংসা, সময় আর উপহারে কোনো সন্তান কি বারবার পিছিয়ে পড়ছে? “ছেলে বলে বেশি” বা “ছোট বলে সব ছাড়” ধরনের অভ্যাস থাকলে আজ থেকেই বদলে ফেলুন। প্রবাসে বড় হওয়া শিশুরা ইনসাফের ব্যাপারে খুব সচেতন থাকে, তাই সেখানে এ বিষয়ে আরও যত্নবান হওয়া জরুরি।

নামায শেখানো: সাত বছরে শুরু, ভালোবাসার সাথে

শিশুকে মায়া দেওয়া আর ইনসাফ করার পরের ধাপ হলো তাকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়তে শেখানো, আর তার প্রথম দরজা নামায। এ ব্যাপারে নবীজী ﷺ একটি পরিষ্কার সময়সূচি দিয়েছেন:

«مُرُوا أَوْلاَدَكُمْ بِالصَّلاَةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ، وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرِ سِنِينَ، وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ»

“তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদের নামাযের আদেশ দাও। দশ বছর হলে নামাযের জন্য (প্রয়োজনে) শাসন করো এবং তাদের বিছানা আলাদা করে দাও।”
(সুনানে আবু দাউদ ৪৯৫; হাসান)

হাদিসের মূল কথা হলো তিন বছরের একটি দীর্ঘ প্রস্তুতি। সাত থেকে দশ বছর পর্যন্ত বারবার বলা, শেখানো আর উৎসাহ দেওয়া, যাতে দশ বছর হওয়ার আগেই পাঁচ ওয়াক্ত নামায সময়মতো আদায় করা শিশুর অভ্যাসে পরিণত হয়। মাসিক আলকাউসারে মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া এই ধাপে ধাপে অভ্যস্ত করার কথাই গুরুত্ব দিয়েছেন। মনে রাখতে হবে, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর পাঁচ ওয়াক্ত নামায সময়মতো আদায় করা ফরজ, কোনো ওয়াক্ত ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তাই শিশুকাল থেকেই তাকে শেখাতে হবে যে স্কুল, খেলা বা অন্য কোনো কাজ নামাযের চেয়ে বড় নয়। স্কুলে থাকলে সেখানেই সময়মতো নামায পড়ার ব্যবস্থা খুঁজে নিতে সাহায্য করুন, প্রয়োজনে শিক্ষকের সাথে কথা বলুন। তবু কোনো কারণে যদি কখনো যোহর কাযা হয়ে যায়, বাসায় ফিরেই সবার আগে কাযাটা আদায় করে নেওয়ার অভ্যাস করান, যাতে সে বোঝে নামায কখনো বাদ দেওয়ার বিষয় নয়।

দশ বছরে “শাসন”-এর কথা নিয়ে অনেক অভিভাবক ভুল বোঝেন। আলেমগণ এর জন্য কঠোর শর্ত দিয়েছেন। আগে বারবার বুঝিয়ে বলতে হবে, শাসন হবে একেবারে শেষ উপায় হিসেবে, খুব হালকা, যাতে ব্যথা বা দাগ না পড়ে। মুখ ও মাথায় কখনোই নয়, রাগের বশে নয়, আর অন্যের সামনে অপমান করে নয়। দারুল উলূম দেওবন্দের একটি ফতোয়ায় শিশুদের নম্রতা ও স্নেহের সাথে শেখানোর কথা স্পষ্ট বলা হয়েছে। উদ্দেশ্য শিশুকে নামাযের প্রতি ভালোবাসা দেওয়া, ভয় দেখানো নয়। তাই সাত বছরের শিশুকে নিজের পাশে দাঁড় করিয়ে নামায পড়ুন, তার জন্য একটা “নামায চার্ট” বানিয়ে প্রতি ওয়াক্তে একটা তারা দিন, আর সপ্তাহ শেষে ছোট্ট একটা পুরস্কার রাখুন। কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে হলে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নিন।

শিশুদের সাথে খেলা ও কোমলতা: নামাযের মধ্যেও ধৈর্য

নামায শেখানোর এই পথে মা-বাবার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধৈর্য। আর রাসূলুল্লাহ ﷺ শিশুদের সাথে খেলা, কোমলতা এবং নামাযের মধ্যেও ধৈর্যের ব্যাপারে অসাধারণ দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। আবু কাতাদা (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজী ﷺ তাঁর নাতনি উমামা বিনতে যায়নাবকে কাঁধে নিয়ে নামায পড়তেন:

«فَإِذَا سَجَدَ وَضَعَهَا، وَإِذَا قَامَ حَمَلَهَا»

“যখন সিজদায় যেতেন, তাকে নামিয়ে রাখতেন; আর যখন দাঁড়াতেন, আবার কোলে তুলে নিতেন।”
(সহিহ বুখারি ৫১৬; সহিহ মুসলিম ৫৪৩)

আরেকবার সিজদায় থাকা অবস্থায় তাঁর পিঠে নাতি চড়ে বসায় তিনি সিজদা দীর্ঘ করেন। নামায শেষে বললেন:

«إِنَّ ابْنِي ارْتَحَلَنِي فَكَرِهْتُ أَنْ أُعَجِّلَهُ»

“আমার এই ছেলে আমার পিঠে সওয়ার হয়েছিল, তাই তাকে তাড়াহুড়ো করাতে চাইনি।”
(সুনানে নাসায়ি; সহিহ)

শিক্ষাটা হলো, শিশুর চঞ্চলতা দেখে বিরক্ত না হয়ে ধৈর্য ধরা। মসজিদে বা ঘরে নামাযের সময় শিশু দুষ্টুমি করলে ধমক দিয়ে তাকে নামায থেকে দূরে সরিয়ে দেবেন না। (নামাযের ভেতরে শিশু কোলে নেওয়ার ফিকহি মাসআলা আলাদা বিষয়; হানাফি ফতোয়ায় এর শর্ত আছে, তাই প্রয়োজনে নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছে জেনে নিন।) দিনে অন্তত পনেরো মিনিট ফোন দূরে রেখে শুধু সন্তানের সাথে খেলুন। ছোট শিশুকে জায়নামাযের পাশে বসিয়ে রাখুন, তার জন্য একটা ছোট জায়নামায কিনে দিন। এভাবেই নামাযের সাথে তার ভালোবাসার একটা সম্পর্ক তৈরি হবে।

তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল

এই সব মায়া, ইনসাফ আর ধৈর্যের পেছনে একটি গভীর দায়িত্ববোধ কাজ করে। সন্তান লালন-পালন আসলে একটি আমানত। নবীজী ﷺ বলেছেন:

«كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ … وَالرَّجُلُ رَاعٍ فِي أَهْلِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ فِي بَيْتِ زَوْجِهَا وَمَسْئُولَةٌ عَنْ رَعِيَّتِهَا»

“তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্বাধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে… পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল, সে তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। নারী তার স্বামীর ঘরের দায়িত্বশীল, সেও তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।”
(সহিহ বুখারি ৮৯৩; সহিহ মুসলিম ১৮২৯)

ভালো স্কুল, ভালো খাবার আর আরামের ব্যবস্থা করা জরুরি। কিন্তু কিয়ামতের দিন প্রশ্ন হবে, সন্তানকে আল্লাহর পরিচয়, কুরআন আর আদব শিখিয়েছি কি না। বাবা-মা দুজনেরই এখানে নিজ নিজ ভূমিকা আছে। সপ্তাহে একদিন দশ-পনেরো মিনিটের একটা পারিবারিক হালাকা রাখতে পারেন, যেখানে একটা ছোট সূরা, একটা হাদিস বা একজন নবীর গল্প থাকবে। বিশেষ করে প্রবাসে, যেখানে চারপাশের পরিবেশ ভিন্ন, সেখানে ঘরই হয়ে উঠতে পারে সন্তানের প্রথম মাদরাসা।

সন্তানের জন্য দোয়া: সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ

সব চেষ্টার পরও হেদায়েত আল্লাহর হাতে। তাই মা-বাবার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার দোয়া। নবীজী ﷺ বলেছেন:

«ثَلاَثُ دَعَوَاتٍ مُسْتَجَابَاتٌ لاَ شَكَّ فِيهِنَّ: دَعْوَةُ الْوَالِدِ، وَدَعْوَةُ الْمُسَافِرِ، وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ»

“তিনটি দোয়া নিঃসন্দেহে কবুল হয়: পিতার দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং মজলুমের দোয়া।”
(সুনানে আবু দাউদ ১৫৩৬; জামে তিরমিযি ১৯০৫; হাসান)

তিরমিযির বর্ণনায় এসেছে, সন্তানের বিরুদ্ধে পিতার দোয়াও কবুল হয়। তাই রাগের মাথায় সন্তানকে বদদোয়া বা অভিশাপ দেওয়া থেকে সাবধান থাকুন। মুখ থেকে যেন সবসময় তার জন্য কল্যাণের দোয়াই বের হয়। কুরআনে শেখানো এই দোয়াটি নিয়মিত পড়ুন:

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

“হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের জন্য চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন এবং আমাদের মুত্তাকীদের ইমাম বানান।”
(সূরা আল-ফুরকান ২৫:৭৪)

প্রতি নামাযের পর সন্তানের নাম ধরে তার জন্য দোয়া করুন। মাঝে মাঝে তার সামনেই দোয়া করুন, যাতে সে জানে মা-বাবা তার জন্য আল্লাহর কাছে চাইছেন। এই অনুভূতিই একদিন তাকেও দোয়ার মানুষ বানাবে, ইনশাআল্লাহ।

শেষ কথা

নবীজী ﷺ-এর আদর্শে প্যারেন্টিং মানে কড়া শাসন নয়, আবার লাগামহীন ছাড়ও নয়। এর মূলে আছে মায়া, ইনসাফ, ধৈর্য, দায়িত্ববোধ আর দোয়া। এর কোনোটিই এক দিনে আসে না। ছোট ছোট অভ্যাস দিয়ে শুরু করুন, আল্লাহ বরকত দেবেন, ইনশাআল্লাহ।

সূত্র ও আরও পড়ুন

আপনার সন্তানকে শুদ্ধভাবে কুরআন শেখাতে চান?
আল-কুরআন একাডেমিতে ওয়ান-টু-ওয়ান অনলাইন ক্লাস হয় আপনার দেশের সময় মিলিয়ে, আমেরিকা, কানাডা, যুক্তরাজ্য বা যেকোনো দেশ থেকে।
নূরানী কায়দা কোর্সনাযেরা কুরআন কোর্সহিফজুল কুরআন কোর্স২টি ফ্রি ট্রায়াল ক্লাস

প্রশ্ন বা মন্তব্য লিখুন · Ask a question

আপনার প্রশ্ন আমাদের টিম দেখে উত্তর দেবে, ইনশাআল্লাহ। / Our team will answer your question, in sha Allah.