অনলাইনে কুরআন শিক্ষক খুঁজতে গেলে আজকাল অসংখ্য বিকল্প পাওয়া যায়। কেউ খুব কম খরচে পড়ান, কেউ বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু সন্তানের কুরআন শিক্ষার ভিত্তি একবার ভুলভাবে তৈরি হলে তা ঠিক করা অনেক কঠিন। তাই শিক্ষক বাছাইয়ের সময় কয়েকটি বিষয় যাচাই করে নেওয়া জরুরি। এই লেখায় সেই বিষয়গুলো সহজভাবে তুলে ধরা হলো।
শিক্ষকের তিলাওয়াত আর তাজবীদ
সবচেয়ে প্রথম আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষকের নিজের তিলাওয়াত শুদ্ধ কি না। ভালো শিক্ষক প্রতিটি হরফ সঠিক মাখরাজ থেকে উচ্চারণ করেন এবং তাজবীদের নিয়ম জানেন ও মেনে পড়েন। শিক্ষক কোথা থেকে পড়াশোনা করেছেন, হাফেয কি না, কোনো মাদরাসা বা প্রতিষ্ঠান থেকে সনদ আছে কি না, তা জিজ্ঞেস করতে দ্বিধা করবেন না। সম্ভব হলে শিক্ষককে কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করে শোনাতে বলুন।
সঠিক আকীদা ও দ্বীনি পরিবেশ
কুরআনের শিক্ষক শুধু পড়া শেখান না, সন্তানের দ্বীনি চিন্তাও গড়ে দেন। তাই শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠান কোন আলেমদের তত্ত্বাবধানে চলে, তাদের আকীদা ও মানহাজ কী, তা জেনে নেওয়া ভালো। শিক্ষকের আচরণ, ভাষা আর ক্লাসের পরিবেশ যেন সন্তানের সামনে একটি ভালো আদর্শ হয়, সেদিকে লক্ষ রাখুন।
মেয়েদের জন্য শিক্ষিকা
মেয়েদের পর্দার বিধান শুধু বালেগা হওয়ার পর থেকে নয়, বরং শরীরে বড় হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলেই, অর্থাৎ সাধারণত নয় বছরের কাছাকাছি বয়স থেকেই, পর পুরুষের সামনে পর্দার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই বড় মেয়েদের জন্য মহিলা শিক্ষিকাই নির্বাচন করা উচিত, পুরুষ শিক্ষকের সামনে পর্দাহীনভাবে বসে পড়া জায়েয নয়। ছোট মেয়েদের ক্ষেত্রেও অনেক পরিবার শুরু থেকেই শিক্ষিকা পছন্দ করেন, যাতে বড় হওয়ার পর শিক্ষক পরিবর্তন করতে না হয়। প্রতিষ্ঠানে যোগ্য মহিলা শিক্ষিকা আছেন কি না, তা ভর্তির আগেই জিজ্ঞেস করে নিন।
ওয়ান টু ওয়ান ক্লাস না গ্রুপ ক্লাস
কুরআন পড়া শেখার ক্ষেত্রে প্রতিটি শিশুর উচ্চারণ আলাদাভাবে শোনা আর শুধরে দেওয়া দরকার। গ্রুপ ক্লাসে শিক্ষক প্রত্যেককে খুব অল্প সময় দিতে পারেন, ফলে ভুলগুলো থেকে যায়। শুরুর দিকে, বিশেষ করে নূরানী কায়দা আর নাযেরার সময়, ওয়ান টু ওয়ান ক্লাস অনেক বেশি কার্যকর।
আপনার দেশের সময় অনুযায়ী ক্লাস
আমেরিকা, কানাডা, যুক্তরাজ্য বা অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশি শিক্ষকের কাছে পড়লে সময়ের পার্থক্য একটি বড় বিষয়। প্রতিষ্ঠান আপনার স্থানীয় সময় অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে ক্লাস দিতে পারে কি না, ডে লাইট সেভিং টাইম বদলালে সময় কীভাবে সমন্বয় করা হয়, আর শিক্ষক অনুপস্থিত হলে ক্লাস পূরণের ব্যবস্থা আছে কি না, তা আগেই জেনে নিন।
ট্রায়াল ক্লাসে কী দেখবেন
ভালো প্রতিষ্ঠান ভর্তির আগে ফ্রি ট্রায়াল ক্লাস দেয়। ট্রায়াল ক্লাসে সন্তানের পাশে বসে কয়েকটি বিষয় খেয়াল করুন। শিক্ষক কি সন্তানের বর্তমান অবস্থা যাচাই করে সেখান থেকে শুরু করছেন, নাকি সবাইকে একই জায়গা থেকে পড়াচ্ছেন? ভুল হলে কি ধৈর্য আর নম্রতার সাথে শুধরে দিচ্ছেন? সন্তান কি ক্লাসে স্বচ্ছন্দ বোধ করছে? ক্লাস শেষে শিক্ষক কি আপনাকে সন্তানের অবস্থা আর পরবর্তী পরিকল্পনা পরিষ্কার করে জানাচ্ছেন?
অগ্রগতির নিয়মিত খবর
মাসের পর মাস ক্লাস চলছে অথচ সন্তান কোথায় আছে আপনি জানেন না, এমন অবস্থা হওয়া উচিত নয়। জিজ্ঞেস করুন, শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠান নিয়মিত অগ্রগতির খবর দেয় কি না, সমস্যা হলে কার সাথে যোগাযোগ করবেন, আর শিক্ষক পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে সেই সুযোগ আছে কি না।
নিরাপত্তা ও অভিভাবকের উপস্থিতি
অনলাইন ক্লাসে শিশুর নিরাপত্তা নিয়েও সচেতন থাকা দরকার। ক্লাস যেন ঘরের খোলা জায়গায় হয়, যেখানে অভিভাবক মাঝে মাঝে দেখতে পারেন। ক্লাস কোন প্ল্যাটফর্মে হয় (যেমন Zoom বা Google Meet), লিংক কে পাঠায়, আর শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ অভিভাবকের মাধ্যমে হয় কি না, তা নিশ্চিত হয়ে নিন।
শেষ কথা
একজন ভালো কুরআন শিক্ষকের মধ্যে শুদ্ধ তিলাওয়াত, সঠিক আকীদা, ধৈর্য আর আন্তরিকতা থাকা চাই, আর প্রতিষ্ঠানের মধ্যে থাকা চাই সময়ের নিয়মানুবর্তিতা, অগ্রগতির স্বচ্ছতা আর নিরাপদ পরিবেশ। খরচ অবশ্যই বিবেচনার বিষয়, কিন্তু শুধু কম খরচ দেখে সিদ্ধান্ত নিলে পরে বেশি মূল্য দিতে হতে পারে। আল-কুরআন একাডেমিতে আপনি ভর্তির আগে ২টি ফ্রি ট্রায়াল ক্লাস নিয়ে নিজেই এই বিষয়গুলো যাচাই করে দেখতে পারেন।
সূত্র: মাসিক আলকাউসার, “শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে কিছু মাসআলার ভুল প্রয়োগ”; দারুল উলূম দেওবন্দ ফতোয়া নং 218/L ও 831/846/L=08/1437; IslamQA প্রশ্ন নং 112709।
